আনিস
ঢাকার ব্যস্ততম মতিঝিলের একটি অফিসের নিম্ন শ্রেণির চাকুরে। প্রতিদিন
যাত্রাপথ আর অফিস মিলে প্রায় চৌদ্দ ঘন্টাই বাইরে কাটে তার। ক্ষীণকায়
মানুষটি রোজকায় খুব সকালে অফিস অভিমুখে যাত্রা করে। বাসের ভিড় আর ঢাকার
বিখ্যাত ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে অফিসে পৌঁছুতে মাঝে মধ্যেই দেরী হয়ে যায়। তখন
বসদের তোপের মুখে পড়তে হয়।
ঢাকা শহরের যে এলাকা থেকেই হোক, সকালের এই সময়টায় বাসে ওঠা মানে রীতিমত
যুদ্ধ করা। সেদিন ছিল সপ্তাহের প্রথম দিন। রোববার। বাস স্টপেজে প্রায় পৌণে
এক ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছে আনিস। অনেক চেষ্টা করেও বাসে উঠতে পারছিল না।
বৈশাখী সূর্য্য তাপ ছড়ানো শুরু করেছে। ধীরে ধীরে রোদের তাপ বাড়ে, সেই সাথে
বাড়ে আনিসের উৎকণ্ঠা। চোখে ভাসে বসদের রক্তচক্ষু।
অকস্মাৎ একটি বাস এসে থামে। ঠিক থামে না বলে বলা যায় যানজটে আটকে যায়। আনিস
হন্তদন্ত হয়ে বাসে ওঠে। ভিড় ঠেলে নিজের ক্ষীনকায় দেহটিকে গলিয়ে দেয় ভিতরে।
উদ্দেশ্য মানুষের মাঝে নিজের জন্য একটু জায়গা করে নেয়া। বাস ছুটে চলে চেনা
গন্তব্যে। হঠাৎ যাত্রীদের মধ্যে কেউ একজন চিৎকার করে ওঠে-
-আমার মানিব্যাগ?
মুহূর্তে সচকিত হয়ে ওঠে দাঁড়ানো যাত্রীরা। কেউ কেউ পিছনে হাত দিয়ে পরীক্ষা
করে দেখে, নিজেদের মানিব্যাগ জায়গামত আছে তো! লোকজনের চিৎকার চেঁচামেচির
মধ্যেই একজন হঠাৎ নিচে দেখিয়ে বলে ওঠে,
-ঐ তো একটা মানিব্যাগ। ওটা কি আপনার?
ব্যাগ হারানো যাত্রী আবিষ্কার করে- তার মানিব্যাগটি পড়ে আছে আনিসের পায়ের কাছে। ফাঁকা। ভিতরের টাকা-পয়সা, কাগজপত্র উধাও।
উৎসাহী জনতার কোন একটা উপলক্ষ হলেই চলে। একজন দু’জন করে চড়াও হয় গোবেচারা
হ্যাংলা মানুষটার উপর। কেতাদুরস্ত নয় সে, অতি সাধারণ গোবেচারা একজন। অতএব
লক্ষ্যবস্তু হিসেবে যথার্থ। কেউ শার্টের কলার, কেউ চুল ধরে কয়েক ঘা দিতে
কার্পণ্য করে না।
-আমি কিছু জানিনা, আমারে মারেন ক্যান? আত্মরক্ষার তাগিদে বলে ওঠে আনিস।
কি আশ্চর্য, তোমাকেই তো মারবে! তাতে প্রশ্ন কেন বাপু?
কারো কারো এই মারের প্রতি উৎসাহটা যেন একটু বেশীই। পকেট থেকে শুরু করে সারা
শরীর তল্লাশি করা হয়। কিছুই মেলে না। তাতে কি? নিশ্চয়ই ওর সাথে অন্য কেউ
আছে। সবকিছু পাস করে দিয়েছে। ওকে আরও কয়েক ঘা লাগাও, সব তথ্য বের হয়ে যাবে।
শুরু হয়ে যায় আবার। রোগা-পাতলা মানুষটির আকুতিতে কি মন গলে?
আসনে বসা যাত্রীদের মধ্য থেকে অনেকে দু-একবার তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেন। কেউ
কেউ বলে ওঠেন, দেশটা চোর-ছ্যাঁচড় আর পকেটমারে ছেয়ে গেছে! আবার কিছু মানুষ
এর সাথে রাজনীতির যোগসূত্র জুড়ে দেন। ব্যাস, একটি গ্রুপের আলোচনার
বিষয়বস্তু বদলে যায়। সেই আলোচনায় পাতি-মাঝারি সারির নেতা থেকে শুরু করে
মন্ত্রী-প্রধান মন্ত্রী পর্যন্ত এসে যান। অফিসগামী বাস- বিচিত্র সব যাত্রী।
রাজনীতি, হত্যা, গুম, দেশ-চিন্তা কত কিছু সেখানে আলোচিত হয়!
ওদিকে ধর-মার আর চিৎকারের মধ্যেই একসময় বাসটি থেমে যায়। পকেটমার হিসেবে ধৃত
লোকটিকে নামিয়ে দেয়া হয় রাস্তার মাঝেই। এক ঝটকায় হাত থেকে গড়িয়ে পড়ে
অল্পদামী খাবার ক্যারিয়ার। খাবার সামান্যই, পড়ে থাকে রাস্তায়- নর্দমার
কাছে। বাসটি ছেড়ে দেয় আবার। লোকটি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে চলে যাওয়া
বাসটির দিকে।
হঠাৎ চলন্ত বাস থেকে ঝাঁকড়া চুলের এক উঠতি যুবক এক লাফে নেমে যায়। এতক্ষণ
যে ছিল বীরের বেশে, পকেটমারের শাস্তির দাবীতে সোচ্চার। বাসটা কিছুটা দূরে
যেতেই সেদিকে তাকিয়ে থাকে। তার মুখে তখন বিদ্রুপের হাসি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন